ব্যবসায় সংগঠন কি এবং এর মৌলিক উপদানসমূহ।

ব্যবসায় সংগঠন কি এবং এর মৌলিক উপদানসমূহ।

ব্যবসায় সংগঠনের ধারণাঃ 

ব্যবসায় হলো মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পণ্য ও সেবাসামগ্রী উৎপাদন, বণ্টন ও এর সহায়ক যেকোনো কাজ। অন্যদিকে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সম্ভাব্য উপকরণসমূহকে যথাযথভাবে সমন্বিত করার কাজকে সংগঠন বলে। 

তাই ব্যবসায় সংগঠন হলো এমন একটি ক্রিয়া বা কাজ যার মাধ্যমে উৎপাদন ও বণ্টনের সাথে সংশ্লিষ্ট উপাদানসমূহকে যথাযথভাবে সমন্বিত করে মুনাফা অর্জনের প্রয়াস চালানো হয়। 

ব্যবসায় সংগঠন ব্যবসায়ের অভ্যন্তরে এমন একটি কাঠামোগত সম্পর্ক নির্দেশ করে যার সাহায্যে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মধ্যে সমন্বয় ঘটে এবং ব্যবসায়ের উপকরণসমূহ যথাঃ যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মূলধন, বাজার ইত্যাদি যথাযথভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের কাজগুলো সাফল্যজনকভাবে সম্পাদন করা যায়। নিম্নে এ প্রসঙ্গে কতিপয় জনপ্রিয় সংজ্ঞা তুলে ধরা হলোঃ 

⚫ প্রখ্যাত ব্যবস্থাপনা বিশারদ কুঞ্জ এবং ও ডোনেল বলেন, সংগঠন হলো একটি সম্পর্কের কাঠামো যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক উপকরণাদি সমবেত হয় এবং উপকরণাদিকে ঘিরে ব্যক্তির প্রচেস্টাবলি সমন্বিত হয়। 

⚫ অধ্যাপক হেনি এর মতে, কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা উদ্দেশ্যাবলি অর্জনের জন্য ব্যবসায়ের বিশেষ বিশেষ অংশ বা উপাদানসমূহকে সুষ্ঠুভাবে সাধনের প্রক্রিয়াকে সংগঠন বলে। 

⚫ J.L. Massie এ সম্পর্কে বলেন, সংগঠন হলো এমন একটি কাঠামো ও পদ্ধতি যা একই উদ্দেশ্যে নিয়োজিত কতিপয় সহযোগী মানুষের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে, পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তাদের কার্যাবলিকে একই সুত্রে গ্রথিত করে। 

মোটকথা, প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত উপকরণাদির কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যে এতে নিয়োজিত মানবীয় শক্তি ও কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রক্রিয়াকে ব্যবসায় সংগঠন বলে। 

কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্দেশ এই প্রক্রিয়ার অধীন. মালিকানার প্রকৃতি অনুযায়ী এরূপ কাজে কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় বিধায় ব্যবসায় সংগঠনকে মালিকানার দৃষ্টিকোণ হতে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। 


ব্যবসায় সংগঠনের মৌলিক উপাদানঃ 

কারবার সংগঠনের আকার ও প্রকৃতি যাই হোক না কেন, এর সাফল্য নির্ভর করে প্রধানত এ সংগঠনের মৌলিক উপাদান বা নীতিগুলোর সুবিন্যস্ততার উপর। নিম্নে আদর্শ কারবার সংগঠনের কয়েকটি মৌলিক উপাদান বা নীতি আলোচনা করা হলোঃ 

উদ্দেশ্য ও কর্মপ্রণালী নির্ধারণঃ 

কারবার গঠন করার আগেই ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্যে কর্মপ্রনালী সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। 

পরবর্তীকালে ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী কারবারের যাবতীয় কার্য সংগঠিত ও পরিচালিত হয়। অতএব অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তবতার ভিত্তিতে কারবারের উদ্দেশ্য ও কর্মপ্রণালী নির্ধারণ করতে হবে। অধিকন্তু উদ্দেশ্য বিস্তারিত হওয়া উচিত। 

কার্যবিভাগীকরণ ও কার্যভিত্তিক কর্তব্য বণ্টনঃ 

আধুনিক কারবার সংগঠনের অন্যতম প্রধান নীতি হলো কার্যের বিভাগীয়করণ এবং ব্যক্তির পরিবর্তে কর্মগুলোকে কার্যের গুরুত্বের ভিত্তিতে বণ্টণ করে দেয়া। 

এতে অযথা সময় ও শ্রমশক্তির অপচয় হয় না। অধিকন্তু সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারে ফলে উৎপাদন খরচ কম হয়। 

তদুপরি এ পদ্ধতিতে কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মী নিয়োগ করা যায় এবং তাদের দক্ষতার কাজে লাগিয়ে কারবারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় 

দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাঃ 

ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা নীতির উপর কারবারের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা নির্ভর করে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা নীতি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এতে শ্রম ও অর্থের কম অপচয় হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সহজ হয়। 

সহযোগিতাঃ 

কারবারের সাফল্য নির্ভর করে এর শ্রমিক-কর্মী ও মালিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্কের উপর। যে কারবারের শ্রমিক কর্মী ও ব্যবস্থাপক বা মালিকের মধ্যে অধিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকে সে কারবার ততবেশি সাফল্য লাভে সক্ষম হয়। 

নমনীয়তাঃ 

কারবারের নির্দেশ বা নীতি পদ্ধতি যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে পরিবর্তন করা যায় সে ব্যবস্থা সংগঠনে থাকতে হবে। 

সমন্বয় সাধন এবং সমতা রক্ষাঃ 

কারবারের প্রতিটি বিভাগের কাজের ও নীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন ও সমতা রক্ষা করা কারবারে সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। সংগঠককে রক্ষ্য রাখতে হবে যাতে এক বিভাগের কাজের জন্যে অন্য বিভাগের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং সকল বিভাগের মধ্যে সমতা বজায় থাকে। 

আদেশের মিল বা ঐক্যঃ 

প্রতিষ্ঠানের কাজের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে অধস্তন কর্মচারীগণকে উপরস্থ অফিসারগণ আদেশ বা নির্দেশ দেয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করবেন যাতে একই সময় দ্বৈত আদেশ দেয়া না হয়। এ অসুবিধা দূর করার জন্যে প্রতিষ্ঠানে আদেশ দেয়ার একটা সুশৃঙ্খল নীতি থাকতে হবে। 

মিতব্যয়ীতাঃ 

কারবার সংগঠনের অন্যতম নীতি হলো প্রতিক্ষেত্রে মিতব্যয়ীতার মাধ্যমে মুনাফা বৃদ্ধি করা। 

পুঁজিঃ 

সুষ্ঠুভাবে কারবার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা কারবার সংগঠনের অন্যতম প্রধান নীতি। কেননা পুঁজির স্বল্পতা বা আধিক্য উভয়ই কারবারের জন্য ক্ষতিকর। 

গবেষণাঃ 

আধুনিক জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক কারবার সংগঠনের অন্যতম উপাদান হলো প্রতি বিষয়ে পূর্ব পরিকল্পনা এবং সে বিষয়ে গবেষণা করা। যা কারবারের ঝুঁকি কমাতে বিশেষভাবে সাহায্য করে এবং সাফল্য অধিক নিশ্চিত করে। 

সংগঠন কাঠামোর সরলতাঃ 

কারবারের সংগঠন কাঠামো যথাসম্ভব সরলভাবে তৈরি করতে হবে। জটিল সংগঠন কাঠামো কারবারের ব্যবস্থাপনা কার্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। 

মোটকথা, আধুনিক বৃহৎ আয়তন কারবার সংগঠনের সাফল্যের চাবিকাঠি হলো এর সুপরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত নিতিমালা বা উপাদানসমূহ এবং এদের সুচিন্তিত বাস্তবায়ন। অতএব যথেষ্ট সতর্কতা ও নিপুণতার সাথে সংগঠনের নিতিমালা তৈরি করতে হবে। 

1 Comments

  1. আপনার পোস্ট গুলো পড়ে যেমন ভালো লাগে ঠিক তেমনি অনেক কিছু শিখতে পারি,, ধন্যবাদ আপনাকে

    ReplyDelete
Previous Post Next Post